ডলারের দামের হেরফেরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা

ডলারের দামের হেরফেরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা

ডলারের দামের হেরফেরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা
ছবি: সংগৃহীত

বৈচিত্র ডেস্ক:দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং খাতে সরল সুদ চালু না হওয়ায় এবং ডলারের দামের হেরফেরের কারণে ধরাশায়ী হচ্ছেন। ঋণ গ্রহণের সময় ডলারের যে দাম ছিল, পরবর্তীকালে তা বেড়েছে। গ্রাহকের কাঁধে ডলারের এই বাড়তি মূল্যের দায় যাচ্ছে। ফলে গ্রাহককে বাড়তি ব্যয় মিটিয়েও ব্যাংকের দায় শোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি, গ্রাহকভেদে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের দ্বিগুণেরও বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে।

ব্যবসা কিংবা শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মেশিনারিজ ও পণ্য আমদানি করতে এলসি খুলতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ৯০, ১২০, ১৮০ ও ৩৬০ দিন আগে ব্যাংক কোনো মেশিনারিজ ও পণ্য আমদানি বাবদ ব্যয়ের হিসাব করে থাকে। কিন্তু আলোচ্য সময়ের মধ্যে কিংবা এর পরেও ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে তা গ্রাহকের কাঁধে চাপে। এমনকি ঋণ পুরোপুরি শোধ না হওয়া পর্যন্ত ডলারের বাড়তি দাম গ্রাহককেই দিতে হয়। এতে করে মোট ব্যয় যেখানে গিয়ে দাঁড়ায় তা গ্রাহক ব্যাংক থেকে নেয়নি। অথচ পরিশোধের সময় তাকে বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি প্রকল্পের বিপরীতে যখন ঋণ দেওয়া হয়, তখন ডলারের যে মূল্য থাকে পরবর্তীকালে তা বেড়ে যায়। বর্তমানে ডলারের মূল্য ৮৫ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম মজুরি, কাঁচামালসহ আনুষঙ্গিক খরচও বেড়ে যায়, যা সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো বাড়িয়ে দেয়। ফলে, তুলনামূলক কম মুনাফায় বাড়তি খরচের বহর মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, গত ২০ বছরে ডলার প্রতি ৩২ টাকা বেড়েছে। ২০০০ সালে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের মূল্য ছিল ৫৪ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৭১ টাকা। আর বর্তমানে তা বেড়ে ৮৬ টাকার ওপরে চলে গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ সুদ হার এবং দণ্ড সুদ। শুধু তাই নয়, ব্যাংকের রয়েছে আরো নানা লুকায়িত চার্জ।

এমন পরিস্থিতিতে, শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। আরো রয়েছে তীব্র জ্বালানিসংকট, যা পণ্যের মান কমাচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যমূল্য কমে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার পরও নিয়মিত কিস্তি দিয়ে গ্রাহক ব্যাংকের দায়মুক্তি পাচ্ছে না। উপরন্তু, কিস্তি খেলাপি হলে সুদের ওপর দণ্ড সুদ আরোপ করা হচ্ছে। ফলে বাড়তি ডলারের মূল্য এবং দণ্ড সুদ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এছাড়া, নীতিগ্রহণেরও সমস্যা রয়েছে। নীতির ধারাবাহিকতা বজায় না থাকা, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নীতিমালার শিথিলতা, গোষ্ঠীবিশেষের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রভৃতি কারণে সত্ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের ক্ষেত্রে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কও গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ, ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ককে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায়ও রয়েছে।

গ্যাসসংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানাই দিনে গড়ে কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ফলে, যৌক্তিক কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধে সামর্থ্যহীন হয়ে পড়া এসব কারখানা মালিককে কোনো রূপ প্রণোদনা দেওয়া না হলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সুবিধার পর সুবিধা তারা নিচ্ছেন। যারা এসব সুবিধা নিচ্ছেন, তাদের ব্যাবসায়িক ইমেজও প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু প্রকৃত অর্থেই যারা উত্পাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে ব্যাংকের কিস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের বিষয়টা উপেক্ষিত রয়েই যাচ্ছে।

সূত্রমতে, ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সঠিক উদ্যোক্তাকে না দিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্স, বেসিক ব্যাংক কেলেংকারি ঘটনায় কিছু না হলেও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ভার বহন করতে হচ্ছে বেশি।